ভিটামিন ই নিয়ে কিছু কথা

ফ্রেড গে ১৯৮৬ সালে এক মনোযোগ আকর্ষণকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যে, এন্টি অক্সিডেন্টগুলো যথা ভিটামিন ‘ই’
ভিটামিন  ‘সি’  ও  বিটা  ক্যারোটিন  হৃদরোগ  প্রতিরোধে  সক্ষম।  তাঁর  এ  তত্ত্বে  স্বাস্থ্য  সচেতন  ব্যক্তিরা  স্বস্তির
নিঃশ্বাস ফেললেন।

পরবর্তীতে  বহু  ল্যাবরেটরী  পরীক্ষায়  যখন  দেখা  গেল  যে  এই  এন্টি  অক্সিডেন্ট  ধমনী  গাত্রের  লো  ডেনসিটি
লাইপোপ্রোটিন বা এল.ডি.এল. এর অক্সিডেশন প্রতিরোধে সক্ষম তখন “এন্টিঅক্সিডেন্ট তত্ত্ব” সর্বত্র অভিনন্দিত
হল।  মন্দ  কোলেস্টেরল  নামে  পরিচিত  এই  এল.ডি.এল.  এর  অক্সিডেশনের  ফলে  ধমনী  গাত্রে
এথেরোস্কেলেরোটিক  লেসন এর  সৃষ্টি  ও ক্রমবৃদ্ধি  ঘটে।  এন্টিঅক্সিডেন্ট  এই  লেসন  সৃষ্টির  প্রাথমিক  ও  প্রধান
উপায়কেই প্রতিহত করে।

খাদ্য উৎস থেকে প্রাপ্ত এন্টিঅক্সিডেন্টগুলোর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেলে দেখা গেল যে এগুলোর মধ্যে ভিটামিন ‘ই’
হৃদরোগ প্রতিরোধে সর্বাধিক সাফল্য প্রদর্শন করছে। এখানে উল্লেখ্য যে, খাদ্যে দু’ধরনের ভিটামিন ‘ই’ পাওয়া
যায়,  টোকোফেরল  ও  টোকোট্রায়েনল। এ  দু’ধরনের  মধ্যে  টোকোট্রায়েনলের কার্যকারিতাই  বেশী  দেখা  গেল।
উদ্ভিজ্জ  তেলসমূহ  যথা, পাম,  রাইস  ব্রান, সয়াবীন, কর্ন,  সানফ্লাওয়ার  ইত্যাদি,  বিভিন্ন প্রকার  বাদাম  ও সবুজ
শাকসব্জী, হুইট জার্ম, ভিটামিন ‘ই’ এর উত্তম উৎস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন ডাব্লু, আই. এর এডভান্সড
মেডিক্যাল  সেন্টার  থেকে  কুরেশী  ও  সহযোগীদের  প্রতিবেদন  যখন  ১৯৮৬  সালে  ল্যান্সেট  মেডিক্যাল জার্নালে
প্রকাশিত  হল  তখন  বিশ্ব-বিজ্ঞানী  সমাজে  সাড়া  পড়ে  গেল।  রিপোর্টে  বলা  হল  যে  বার্লি  থেকে  আহরণ  করা
টোকোট্রায়েনল উপাদানটি কোলেস্টেরল বাইওসিনথেসিস এর প্রথম এবং রেট-লিমিটিং; ধাপকে প্রতিহত করতে
সক্ষম। এর অর্থ হচ্ছে যে স্ট্যাটিনের মত টোকোট্রায়েনলেরও কোলেস্টেরল হ্রাস করার ক্ষমতা রয়েছে। উল্লেখ্য
যে হাইপার কোলেস্টেরোলেমিক রোগীদের চিকিৎসায় ডাক্তাররা স্ট্যাটিন নামক ওষুধ প্রদান করেন।

১৯৮৬ সালে  টোকোট্রায়েনল  কেন্দ্রিক এই চমকপ্রদ ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় আরও ১৫ বছর পরে অর্থাৎ ২০০১
সালে সুইজারল্যান্ডে  রোশ  ভিটামিন প্রতিষ্ঠানের  ভিটামিন ও পুষ্টি গবেষণা  বিভাগের গবেষকরা হ্যামস্টার মডেল
ব্যবহার করে  টোকোট্রায়েনল ও গামা  টোকোট্রায়েনল এর  যে  হিতকর  ক্রিয়া প্রমাণ করেন তাতে  ভিটামিন  ‘ই’
সম্পর্কে যাঁরা সংশয় প্রকাশ করতেন তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে যান।

সুইস  সমীক্ষাটা  বিশেষ  করে  আকর্ষণীয়  ছিল  এজন্য  যে  এই  সমীক্ষায়  হ্যামস্টারের  একটা  গ্র“পকে স্ট্যাটিন
(সিমভাস্ট্যাটন) ওষুধ দিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছিল। আর হ্যামস্টারের অন্য দু’গ্র“পকে ক্রমাগত বর্দ্ধিত মাত্রায়
আলাদাভাবে টোকোট্রায়েনল ও গামা-টোকোট্রায়েনল দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। মূল হাইপারকোলেস্টেরলেমিক
ডায়েট হিসেবে নারকেল-সমৃদ্ধ চৌ ব্যবহার করা হয়েছিল। পরীক্ষণীয় দ্রব্যগুলো মূল ডায়েটের সংগে মিশ্রিত করে
প্রাণীগুলোকে ৪ সপ্তাহ ধরে খাওয়ানো হয়েছিল। দু’সপ্তাহ পরেই ফলাফল পাওয়া গেল। যাদেরকে কোন ওষুধ বা
ভিটামিন  খাওয়ানো  হয়েছিল  তাদের  প্লাজমা  কোলেস্টেরল  উল্লেখযোগ্যভাবে  হ্রাস  পেতে  দেখা  গেল।
সিমভাস্ট্যাটিন  এর  ক্ষেত্রে  ৫৪%,বর্দ্ধিত  মাত্রায়  টোকোট্রায়েনলের  ক্ষেত্রে  ১৬.৫%  ও  বর্দ্ধিত  মাত্রায়  গামা-টোকোট্রায়েনলের  ক্ষেত্রে ২৩.১%  কোলেস্টেরল হ্রাস লক্ষ্য করা  গেল। এই সমীক্ষায় আরও প্রতীয়মান হল  যে
কোলেস্টেরল  হ্রাসে  টোকোট্রায়েনল আইসোমারগুলোর  মধ্যে  গামা-টোকোট্রায়েনল  ভূমিকাই  প্রধান। এর আগে
১৯৯৬ সালে কেমব্রিজ হার্ট এন্টিঅক্সিডেন্ট স্টাডি গ্র“প ল্যান্সেট পত্রিকায় এক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এ গ্র“পটি তাদের সমীক্ষায় দেখায় যে প্রতিদিন ৪০০-৮০০ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট ভিটামিন ‘ই’ গ্রহণে মারাত্মক
নয় এমন হৃদরোগ ৭৭% হ্রাস পায়। তাঁরা বলেন এ মাত্রায় ভিটামিন গ্রহণ নিরাপদ।

অতি  সম্প্রতি  ২০০৩  সালে  তোহোকু  বিশ্ববিদ্যালয়ের  গ্রাজুয়েট  স্কুল  অফ  লাইফ  সায়েন্স  এন্ড  এগ্রিকালচার
বিভাগের এইচ ইনোকুচি ও তাঁর সহকর্মীরা ভিটামিন ‘ই’ নিয়ে সমীক্ষা চালান যা বায়োসায়েন্স বায়োটেকনোলজী
এন্ড  বায়োকেমিষ্ট্রি  জার্ণালে  প্রকাশিত  হয়।  তাঁরা  ভিটামিন  ‘ই’  যৌগগুলোর  বিশেষ  করে  টোকোট্রায়েনল  এন্টি
এনজিওজেনিক  ধর্ম  নিয়ে  সমীক্ষা  চালান।  তাঁরা  দেখেন  যে  টোকোট্রায়েনল  গবাদি  পশুর  মহাধমনীর
এন্ডোথেলিয়াল  কোষের সংখ্যা ও  টিউব ফরমেশন উভয়ই প্রতিহত করতে পারে  কিন্তু  টোকোফেরোল তা পারে
না।  এই  গ্র“পটির  পর্যবেক্ষণে  আবার  পাওয়া  যায়  যে  টোকোট্রায়েনল  আইসোমারগুলোর  মধ্যে  ডেল্টা
টোকোট্রায়েনল অধিক সক্রিয়। গবেষকরা আরও  রিপোর্ট করেন যে  টিউমার এনজিও জেনেসিস ন্যুনতম পর্যায়ে
রাখার জন্য থেরাপিউটিক ডায়েটারী সাপ্লিমেন্ট হিসেবে টোকোট্রায়েনল ব্যবহার যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।

তবে ভিটামিন ‘ই’ এর হৃদরোগ প্রতিরোধে সাফল্যের পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে তেমন কোন কার্যকর ফলাফল
না  পাওয়ারও  তথ্য  পাওয়া  গেছে,  যেমন  Heart  Outcomes  Prevention  Evaluation  (HOPE)
সমীক্ষায় দেখা গেছে যে হৃদরোগে আক্রান্ত রুগীদের মধ্যে যাদের ভিটামিন ‘ই’ খাওয়ানো হয়েছে আর যাদের
খাওয়ানো হয়নি সকলের ক্ষেত্রেই ফলাফল একই হয়েছে। অর্থাৎ ভিটামিন ‘ই’ খাওয়ানোর কোন উপকার উপলব্ধি
করা যায় নি।

সম্প্রতি ল্যান্সেটে প্রকাশিত তথ্যেও একই রকম দাবী করা হয়। তবে ল্যান্সেটে  যে পদ্ধতিতে পরিচালিত জরীপ
রিপোর্ট নিয়ে ভিটামিন ‘ই’-এর বিপক্ষে মতামত দেয়া হয়েছে তা একটি বিতর্কিত পদ্ধতি এবং এর সার্বজনীনতা
নেই। এমন দাবী করেছেন বাংলাদেশের দু’জন বিশিষ্ট গবেষক। এরা হচ্ছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য
বিজ্ঞান  ইনষ্টিটিউটের অধ্যাপক  ডাঃ  শাহ  মোঃ  কেরামত  আলী  ও  বারডেমের  গবেষক অধ্যাপক  ডাঃ  লিয়াকত
আলী।  তাদের  মতে  ল্যান্সেটে  প্রকাশিত  প্রতিবেদনটি  মেটা  এনালিসিসের  পদ্ধতি  তৈরী।  এটা  বেশীরভাগ
বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ভিটামিন-ই এর বিপক্ষে কোন জোরালো বক্তব্য দিতে হলে আরও গবেষণার
দরকার।