ইফতার সামগ্রী তৈরিতে পাম তেল একটি অনন্য উপকরণ

বাঙালী ভোজনরসিক। বাঙালীর ইফতারীতেও চাই মুখরোচক খাবার। তাছাড়া সারাদিন রোজা রাখার পর এমনিতেই
মানুষের মন চায় মুখরোচক খাবার  খেতে। আর তাই আমাদের ইফতারীতে  দেখা যায় ভাজাভুনা খাবারের প্রাধান্য।
ভাজাভুনা খাবার তৈরিতে তেল/চর্বির ভূমিকা অনস্বীকার্য, কারণ তেল/চর্বি খাবারকে সুস্বাদু করে তোলে।

ভাজাভুনা  এমন  একটি  রন্ধন  প্রক্রিয়া  যা  শুধু  বাসাবাড়িতেই  নয়—রেস্টুরেন্টে,  ফাস্টফুড  তৈরিতে,  মেজবানি  খানা
তৈরিতে এবং খাদ্য শিল্পেও প্রয়োগ করা হয়। ভাজাভুনা খাবার তৈরিতে তেল/চর্বির প্রয়োগ খাদ্যকে শুধু সুস্বাদুই করে
না  খাদ্যকে  পুষ্টিকরও  করে  তোলে।  তেল/চর্বি  খাদ্যকে  স্বাদ  ও  সৌরভ  প্রদান  করা  ছাড়াও  শক্তির  উৎস  হিসেবে,
তেল/চর্বিতে দ্রবীভূত ভিটামিনের বাহক হিসেবে এবং অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডের যোগানদার হিসেবে কাজ করে।

ফ্রায়িং বা ভাজাভুনা দু’ধরণের। এক হল শ্যালো ফ্রায়িং বা অল্প তেলে ভাজা, আর অন্যটি হ’ল ডীপ ফ্রায়িং বা ডুবো
তেলে ভাজা। শ্যালো ফ্রায়িংয়ে  ব্যবহৃত  তেলের প্রায় সবটুকুই ভাজা খাদ্যে  শোষিত  হয়ে যায়, আর ডীপ ফ্রায়িংয়ে
অনেক বেশী পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হয় বলে ডীপ ফ্রায়িংয়ে ব্যবহৃত তেলের সামান্য পরিমাণ খাদ্যে শোষিত হয়
এবং অবশিষ্ট  তেল কয়েকবার  ব্যবহার  করা  হয়।  ভাজাভুনা  যেহেতু  উচ্চ তাপমাত্রায় করা  হয়  সেহেতু  ভাজাভুনায়
ব্যবহৃত  তেলটি এমন হতে হবে যা উচ্চ তাপমাত্রায়  স্থিতিশীল।  তেলে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলে তা উচ্চ
তাপমাত্রায় স্থিতিশীল হয়। যে তেলে অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি সে তেল ভাজাভুনার জন্য অনুপযুক্ত।

আমাদের দেশে ভাজাভুনা খাবার তৈরিতে সাধারনত: পাম, সয়াবীন, সরিষা, বনস্পতি ইত্যাদি তেল/চর্বি ব্যবহার করা
হয়। সয়াবীন তেলে বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বেশি থাকায় অনেকে এ তেলকে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে নিরাপদ মনে
করেন। তবে বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড  বেশি থাকার কারণেই ভাজাভুনা খাবার  তৈরির  ক্ষেত্রে এ  তেল অনুপযুক্ত।
আগেই  বলা  হয়েছে ভাজাভুনা করতে  হয় উচ্চ তাপমাত্রায়। আর এই উচ্চ তাপমাত্রায়  বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড
সমৃদ্ধ  তেলে উৎপন্ন হয় মানব  দেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। ২০০৫ সালে আমেরিকান অয়েল  কেমিস্টস
সোসাইটি  (AOCS)  এর  ৯৬তম  বার্ষিক  সভায়  উপস্থাপিত  এক  গবেষণালব্ধ  ফলাফলে  জানানো  হয়  যে,  উচ্চ
তাপমাত্রায়  সয়াবীন  তেলে  এইচ.এন.ই.  (H.N.E.)  নামক  একটি  রাসায়নিক  বিষাক্ত  যৌগ  উৎপন্ন  হয়  যার  সঙ্গে
এথেরোসক্লেরোসিস  (ধমনী অবরুদ্ধ  হওয়া  যার পরিণতিতে হৃদরোগ  হয়),  স্ট্রোক, পারকিনসনস, আলঝেইমারস,
হান্টিংটনস  ডিজিজ এবং  যকৃতের  বিভিন্ন অসুখের  সম্পর্ক  রয়েছে।  বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড  সমৃদ্ধ  তেলের আর
একটা  অসুবিধা  হল উচ্চ তাপমাত্রায় এ ধরণের তেলের ধোঁয়া, ফেনা বা অস্বাস্থ্যকর পলিমার গঠনের প্রবণতা থাকে।

এজন্য বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ তেলকে হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছুটা সম্পৃক্ত করা হয় যাতে এর
জারণরোধী  ক্ষমতা  বাড়ে।  এই  হাইড্রোজিনেটেড  উদ্ভিজ্জ  তেলই  হচ্ছে  বনস্পতি  বা  উদ্ভিজ্জ  ঘি।  বনস্পতি  উচ্চ
তাপমাত্রায় ফ্রায়িংয়ের জন্য বেশ উপযুক্ত এবং বনস্পতিতে ভাজা খাবার সুস্বাদুও বটে।

কিন্তু সাম্প্রতিক কালে পরিচালিত  কিছু সমীক্ষায় হাইড্রোজিনেটেড উদ্ভিজ্জ  ঘি এর ক্ষতিকারক ভূমিকা সম্পর্কে জানা
গেছে। সমীক্ষায় দেখা  গেছে  যে, উদ্ভিজ্জ চর্বি  দিয়ে রান্না করা খাবার প্রাণীজ সম্পৃক্ত চর্বি (ঘি, মাখন ইত্যাদি)  দিয়ে
রান্না করা  খাবারের  চাইতে  অধিক  ক্ষতিকর। আমেরিকায়  সাধারণত  সয়াবীন বা কর্ন  তেলকে  হাইড্রোজিনেশন
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভিজ্জ চর্বিতে রূপান্তরিত করা হয়। এ রূপান্তর প্রক্রিয়ায় তেলে ট্রান্স-ফ্যাট উৎপন্ন হয় যা দেহে
মোট কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকারক এলডিএল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা
হ্রাস করে। যার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া ট্রান্স ফ্যাটের কারণে জন্ম ত্র“টি, ক্যান্সার ইত্যাদিও হতে পারে।
এসব কারণে  মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের  দেশগুলোতে  ট্রান্স ফ্যাটের  ব্যবহার সীমিত অথবা শূন্য করার
পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী সরিষার তেলে একক-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বেশি থাকায় এ তেল শরীরের জন্য বিশেষ করে
হার্টের জন্য উপকারী। ভাজাভুনার জন্যও এ তেল ভাল। কিন্তু সরিষার তেলে ইরুসিক ফ্যাটি এসিড অধিক পরিমাণে
আছে  যা  শরীরের  জন্য  নিরাপদ  নয়।  ইরুসিক  এসিড  সহজে  হজম  হতে  চায়  না।  এছাড়া  এই  এসিড  হার্টের
পেশিগুলোকে দুর্বল করে ফেলে বলে জানা গেছে। এজন্য পাশ্চাত্য জগতে কম ইরুসিক এসিড সম্পন্ন সরিষার তেল
উৎপাদন করা  হয়। কানাডায়  উৎপাদিত  কম  ইরুসিক এসিড  সম্পন্ন  সরিষার  তেল  ‘ক্যানোলা’  নামে  পরিচিত  যা
ভালমানের স্বাস্থ্যপ্রদ  ভোজ্য  তেল  হিসেবে সমাদৃত। তবে আমাদের  দেশের এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় সরিষার
তেলের জনপ্রিয়তা এখন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। কারণ, এক হল এর বেশি দাম আর দ্বিতীয়ত বর্তমান প্রজন্মের কাছে
সরিষার  তেলের  ঝাঁজাল  গন্ধটা  তেমন  প্রিয়  নয়  যা  আগের  প্রজন্মের  কাছে  অত্যন্ত  প্রিয়  ছিল।  সরিষার  তেলের
প্রাপ্যতাও সয়াবীন বা পাম তেলের তুলনায় কম।

এগুলো  দিক  বিবেচনা  করলে  পাম  তেলের  উপযোগিতাটা  বোঝা  যাবে।  পাম  তেলে  সম্পৃক্ত  ও  অসম্পৃক্ত  ফ্যাটি
এসিডের সুষম সমাহার ঘটায় উচ্চ তাপমাত্রায় পাম  তেল স্থায়ী এবং  তেলটির  ধোঁয়া,  ফেনা বা অস্বাস্থ্যকর আঠালো
পলিমার গঠনের প্রবণতা অনেক কম। উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজাভুনার কাজে পাম  তেল বেশ উপযোগী। এ  তেলে প্রায়
৫০% সম্পৃক্ত  ফ্যাটি  এসিড  থাকায়  পাম  তেল  দিয়ে  ভাজা  খাদ্য  সামগ্রী  বেশ  সুস্বাদু এবং  দীর্ঘ  সময়  পর্যন্ত

খাদ্যোপযোগী  থাকে। আবার  উদ্ভিজ্জ  ঘি এর  মত এতে  কোন  ট্রান্স ফ্যাট  না  থাকায় এ  তেল  নিরাপদ। পাম  তেল
কোলেস্টেরল  মুক্ত,  সহজপাচ্য  এবং  দেহে  সহজে  শোষিত  হয়।  পাম  তেলে  লিনোলিক এসিড  নামে অত্যাবশ্যকীয়
ফ্যাটি এসিড রয়েছে যা দেহের জন্য অত্যাবশ্যক কিন্তু দেহ তা তৈরি করতে পারে না। পাম তেল ব্যবহারের মাধ্যমে
দেহ তা পেতে পারে। পাম তেল পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। পাম তেলে ভিটামিন ‘ই’ ও ‘এ’ রয়েছে। এই ভিটামিনগুলোর কারণে
পাম তেল নিয়মিত ব্যবহারে দেহে উপকারী এইচডিএল (High Density Lipoprotein) কোলেস্টেরলের মাত্রা
বাড়ে এবং ক্ষতিকর এলডিএল  (Low Density Lipoprotein)  কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। পাম  তেল রক্তের
জমাট বাঁধা প্রবণতা হ্রাস করে। এসব কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

ইফতার সামগ্রী তৈরিতে পাম তেল নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যেতে পারে যা খাবারকে করবে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।