চর্বি খেতে নেই মানা

আধুনিক যুগে আমরা চর্বি আতংকে ভুগছি। কারণ দেহে প্রয়োজনের অতিরিক্ত চর্বি জমলে আমরা বিভিন্ন মারাত্মক
রোগের শিকার হই যার পরিণতিতে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। এরপরও কিন্তু চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি খাদ্যানুরাগীদের আকর্ষণ
কম নয়। এটা অনস্বীকার্য্য যে চর্বি খাবারকে সুস্বাদু করে তোলে। কাজেই ভোজন বিলাসীদের পক্ষে চর্বিযুক্ত খাবার
একেবারে পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়। তবে পরিমিত পরিমাণ তেল/চর্বি আহার করা দেহের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং তা
উপকারই করে।

অতিরিক্ত তেল/চর্বিযুক্ত খাবার বা চর্বি মানবদেহে হজম হবে কি করে – এ প্রশ্ন অনেকের মনে জাগতে পারে। প্রাণ
রসায়ন বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিজ্ঞান নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন তাঁরা এ সম্পর্কে অবহিত। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে
তা জানা সম্ভব নয়। এমন কি যাঁরা সুশিক্ষিত অথচ প্রাণ রসায়ন বা পুষ্টি বিজ্ঞান পড়েননি তাঁদেরও এ সম্পর্কে ধারণা
অষ্পষ্ট। অনেকে মনে করেন, যে খাদ্যগুলো সাধারণ তাপমাত্রায় জমাট অবস্থায় থাকে সে খাদ্যগুলো হজম হবে না।
মানব দেহের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় যে সকল
খাবার জমাট থাকবে তা দেহ হজম করতে পারবে না। এ ধরণের খাদ্যের মধ্যে চর্বি হ্েচ্ছ প্রধান। কোন কোন চর্বির
গলনাংক ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর বেশ উপরে। চর্বি প্রেমিকদের জন্য খুবই শংকার বিষয়। কিন্তু না, ভয়ের কিছু
নেই। চর্বি হজম হয় ভিন্ন পদ্ধতিতে।

মানবদেহ বিভিন্ন এনজাইম সৃষ্টি করে যা প্যানক্রিয়েটিক জুসে রক্ষিত থাকে এবং এলকালাইন মাধ্যমে কাজ করে।
পরিপাক ক্রিয়ায় এনজাইমগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই এনজাইমগুলোই দেহে খাদ্য হিসেবে গ্রহণকৃত
চর্বিস্থিত ট্রাইগ্লিসারাইড, ফসফোলিপিড ও কোলেস্টেরল এস্টারের পরিপাক ক্রিয়ায় সহায়তা করে। এই
এনজাইমগুলো ট্রাইগ্লিসারাইড ও ফসফোলিপিডের মধ্যে অবস্থিত গ্লিসারল অণুগুলোর বাইরের দিকের র্কাবন
অবস্থান থেকে ফ্যাটি এসিডগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে এবং প্রাণীদেহে তা সহজে হজম হতে সাহায্য করে।

তেল/চর্বি হল ফ্যাটি এসিডের ট্রাইগ্লিসারাইড। সম্পৃক্ততার উপর ভিত্তি করে তেল/চর্বিকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা
হয়েছে। যথা, সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড, একক-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড ও বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড। তেল আর চর্বির
মধ্যে পার্থক্য হলো গলনাংকের ব্যাপারে। তেলের গলনাংক কম, আর চর্বির গলনাংক বেশি। তাই সাধারণ তাপমাত্রায়
তেল তরল আর চর্বি জমাট অবস্থায় থাকে। গলনাংকের কম বেশি হওয়াটা আবার নির্ভর করে তেল/চর্বিতে সম্পৃক্ত,
একক-অসম্পৃক্ত আর বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের বিন্যাস ও পরিমাণের রকমফেরের উপর।

তেল/চর্বি সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ হলে তার গলনাংক বেশি হবে, অপরপক্ষে যে সব তেল/চর্বিতে একক-অসম্পৃক্ত

ও বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বেশি থাকবে সেগুলোর গলনাংক কম হবে। উচ্চ গলনাংকের তেল/চর্বি খাদ্য হিসেবে
গ্রহণ করা হলে দেহে এমন এনজাইম তৈরি হয় যা দীর্ঘ শৃঙ্খল সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের দুটো হাইড্রোজেন পরমাণু
সরিয়ে ফ্যাটি এসিডে একটি সিস-ডাবল বন্ডের সৃষ্টি করে। ফ্যাটি এসিডের অণুটি তখন সিস-ডাবল বন্ডের স্থানে বেঁকে
যায় এবং অণুগুলো আগের মত সুবিন্যস্ত না থাকার কারণে ফ্যাটি এসিডের গলনাংক কমে যায়।

স্টিয়ারিক এসিড নিয়ে আলোচনা করলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। এই এসিড একটি ১৮ কার্বনের স¤পৃক্ত ফ্যাটি
এসিড। এই ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায় প্রধানত: গরুর মাংস, খাসীর মাংস, ডিম, মিল্ক ফ্যাট ইত্যাদিতে। আর উদ্ভিজ্জ
তেলে এই ফ্যাটি এসিড থাকে সামান্য পরিমাণে। স্টিয়ারিক এসিডের ৯নং ও ১০ নং কার্বনের একটা একটা করে
হাইড্রোজেন পরমাণু সরিয়ে ওখানে একটা সিস-ডবল বন্ড সৃষ্টি করলে এই এসিড আর স্টিয়ারিক এসিড থাকবে না,
তা পরিণত হবে ওলিক এসিডে। স্টিয়ারিক এসিডের গলনাংক ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। স্বাভাবিকভাবেই তা সাধারণ
তাপমাত্রায় (২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস) জমাট অবস্থায় থাকবে। এমন কি মানবদেহের তাপমাত্রা অর্থাৎ ৩৭ ডিগ্রী
সেলসিয়াসেও তা জমাট থাকবে। কিন্তু যখন এই স্টিয়ারিক এসিড পরিণত হয় ওলিক এসিডে তখন তার গলনাংক হয়
মাত্র ১৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তা মানবদেহের তাপমাত্রা তো বটেই, সাধারণ তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে এবং মানবদেহে
শোষিত হবে। কাজেই ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা আরো বেশী গলনাংক বিশিষ্ট চর্বি খেলেও ভয়ের কিছু নেই। পরিমিত
মাত্রায় তা গ্রহণ করলে দেহে সৃষ্ট এনজাইমগুলো স্টিয়ারিক এসিডকে ওলিক এসিডে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় চর্বিস্থিত
সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডকে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডে রূপান্তরিত করে প্রাণী দেহে সহজে হজম ও শোষিত হওয়ার ব্যবস্থা
করে দেয়। এখন বুঝতে অসুবিধা নেই, যে সব ভোজ্য তেল/চর্বিতে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি
যেমন পাম তেল, গাওয়া ঘি, মাখন, বনস্পতি, মার্জারিন ইত্যাদি, সেগুলো হজমেও কোন সমস্যা হয় না।

আর তা যদি না হত, তাহলে প্রতিদিন মানুষ যে চর্বিসমৃদ্ধ খাদ্য যথা গরুর মাংস, খাসীর মাংস, দুধ, ডিম, ঘি এমন
কি একক-সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত উদ্ভিজ্জ তেল ইত্যাদি খাচ্ছে তাতে শরীরে চর্বির পাহাড় জমে যেত।