টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ কোলেস্টেরল কমাতে ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে

ভিটামিন  ‘ই’ এর উপকারী ভূমিকা  নিয়ে এ  যাবৎ গবেষণা কম  হয়নি। তাই অনেকের কাছেই  ভিটামিন  ‘ই’ একটি
সুপরিচিত  নাম।  কিন্তু  ভিটামিন  ‘ই’  যে  দ’ুধরণের  তা  হয়তো  অনেকের  জানা  নেই।  প্রকৃতিতে  টোকোফেরল  ও
টোকোট্রায়েনল―এই দুধরণের ভিটামিন ‘ই’ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ভুট্টা, গম ও সয়াবীন থেকে পাওয়া টোকোফেরল
ভিটামিন  ‘ই’  নিয়েই  বেশি  গবেষণা  হয়েছে।  কিন্তু  এখন  টোকোট্রায়েনল  ভিটামিন  ‘ই’  এর  প্রতি  গবেষকরা  বেশি
গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ টোকোফেরল এর চাইতে টোকোট্রায়েনলের জারণরোধী গুণ (antioxidant properties)
অনেক বেশী। টোকোট্রায়েনল পাওয়া যায় পাম তেল, রাইস ব্র্যান তেল, ওট ও বার্লিতে।

পাম তেলে ১০০০  পি.পি.এম (পার্টস পার  মিলিয়ন) এর উপরে  ভিটামিন  ‘ই’ আছে। পাম তেলে  বিদ্যমান  ভিটামিন
‘ই’  এর  ৭০  শতাংশই  হচ্ছে  টোকোট্রায়েনল  ও  অবশিষ্ট  ৩০  শতাংশ  টোকোফেরল।  টোকোট্রায়েনলের  জানা
উৎসগুলোর মধ্যে পাম  তেলই সমৃদ্ধতম। এছাড়া ক্যারোটিনয়েডের সমৃদ্ধতম প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ উৎসগুলোর অন্যতম
হচ্ছে অপরিশোধিত পাম তেল। ক্যারোটিনয়েড থেকে দেহে ভিটামিন ‘এ’ তৈরী হয়। উল্লেখ্য যে, ভিটামিন ‘এ’রও
জারণরোধী গুণ রয়েছে। পাম  তেলে গাজরের তুলনায় ১৫ গুণ ও টম্যাটোর তুলনায় ৫০ গুণ অধিক ক্যারোটিনয়েড
রয়েছে। আর কোন উদ্ভিজ্জ তেলে এরকম উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যারোটিনয়েড নেই।

সম্প্রতি রচেস্টার ইউনিভার্সিটির একজন বিজ্ঞানী যিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এন্টিঅক্সিডেন্ট নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি
বলেছেন টোকোট্রায়েনল ইঁদুরদের কোলেস্টেরল কমায়। চলমান গবেষণায় আরও আভাস পাওয়া গেছে যে মানব দেহে
সংক্রমণ  ও  ক্যান্সার  প্রতিরোধে  টোকোট্রায়েনল  সম্ভাবনাময়  ভূমিকা  রাখতে  পারে।  রচেস্টার  বিশ্ব  বিদ্যালয়ের  এই
বিজ্ঞানীর  নাম  ডক্টর  মোহাম্মদ  মিনহাজুদ্দিন। ২০০৫ সালের  মে  মাসের ফুড এন্ড  কেমিক্যাল  টক্সিকোলাজি জার্ণালে
ডক্টর  মোহাম্মদ  মিনহাজুদ্দিন  ও  তাঁর  সহকর্মীদের  গবেষণা  সম্পর্কে  নিবন্ধ  প্রকাশিত  হয়েছে।  তাঁরা  দেখিয়েছেন  যে
ভোজ্য তেলের টোকোট্রায়েনল সমৃদ্ধ অংশ পরিপূরক খাদ্য হিসেবে প্রাণীদেরকে খাওয়ানোর পর তাদের কোলেস্টেরল
৪২% হ্রাস পেয়েছে এবং এল.ডি.এল বা মন্দ কোলেস্টেরল হ্রাস পেয়েছে ৬২%। দেহে  কোলেস্টেরলের  জৈব  সংশ্লেষণে  সাহায্যকারী  এনজাইম  হল  এইচএমজি―সিওএ  (HMG―CoA)।
টোকোট্রায়েনল এই এনজাইমের  ক্রিয়াকে প্রতিহত করে  দেহে  কোলেস্টেরলের পরিমাণ  হ্রাস করে।  কিন্তু  যে  কোন
ধরণের  ভিটামিন  ‘ই’  বেশি  দিন  ব্যবহার  করা  উচিত  নয়।  এর  একটা  ক্ষতিকর  প্রভাব  রয়েছে। সে  কারণে

মিনহাজুদ্দিনের এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল টোকোট্রায়েনলের ন্যূনতম কোন মাত্রায় সর্ব্বোচ্চ জারণরোধী ক্রিয়া প্রকাশ
পাবে এবং তা দেহে কার্যকরভাবে কোলেস্টরল হ্রাস করবে।

গবেষনায় দেখা যায় যে, সর্বাপেক্ষা কার্যকর মাত্রা হচ্ছে প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য প্রতিদিন ৮ ইন্টারন্যাশনাল
ইউনিট  (IU)। উদহারণস্বরূপ ৭০  কেজি ওজনের  কোন ব্যাক্তির জন্য কার্যকর মাত্রা  হবে প্রতিদিন ৫৬০ আই.ইউ
ভিটামিন ‘ই’, যা সচরাচর গৃহীত ৪০০ আই.ইউ ভিটামিন ‘ই’ এর কাছাকাছি। উল্লেখ্য যে, ভিটামিন ‘ই’ এর সহনীয়
সীমা হল ১৫০০ আই.ইউ।

দেহে  কোলেস্টেরলের  মাত্রা কমানোর জন্য  প্রচলিত কার্যকর  ওষুধ  হল স্ট্যাটিন  যা  বেশ জনপ্রিয়তা  লাভ করেছে।
এছাড়া নিয়ন্ত্রিত খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমেও কোলেস্টেরল হ্রাস করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও গবেষকরা স্বাভাবিক
কোন  উপায়ে  কোলেস্টেরল  হ্রাস  করা  যায়  কিনা  তা  অনুসন্ধান  করে  দেখছেন।  মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রে  লক্ষ  লক্ষ  লোক
স্ট্যাটিন ব্যবহার করে সুফল পেলেও এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং এ ওষুধ বেশ দামী। রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের
পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের সহযোগী গবেষক মিনহাজুদ্দিন জানিয়েছেন যে, বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত টোকোট্রায়েনলের কোন
বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাননি।

ভারত  থেকে আগত  মিনহাজুদ্দিন ভারতেও  টোকোট্রায়েনল  নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন। এই গবেষণার অপ্রকাশিত
প্রাথমিক  উপাত্ত  অনুযায়ী  টোকোট্রায়েনল  যেমন  প্রাণীদেহে  তেমনই  মানবদেহে  কোলেস্টেরল  হ্রাস  করতে  সক্ষম।
পাঁচজন  স্বাস্থ্যবান  স্বেচ্ছাসেবী  যাদের  দেহে  কোলেস্টেরলের  মাত্রা  স্বাভাবিক  পর্যায়ে  অর্থাৎ  ১৭০-২৩০
মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার  ছিল তাদেরকে চার সপ্তাহ ধরে প্রতি  কেজি ওজনের জন্য প্রতিদিন ৮ আই.ইউ  টোকোট্রায়েনল
ভিটামিন ‘ই’ সেবন করানো হয়। চার সপ্তাহ পর দেখা যায় যে, তাদের এল.ডি.এল কোলেস্টেরলের মাত্রা ২৬% হ্রাস
পেয়েছে এবং  মোট  কোলেস্টেরলের মাত্রা  ১০% হ্রাস  পেয়েছে। আর একটি  ক্ষেত্রে ভারতের পাঁচ বছর বয়সী এক
শিশু, যে জেনেটিক্যালী হাইপারকোলেস্টেরোলোমিয়াতে ভুগছিল এবং তার কোলেস্টেরলের পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে
৪৪০ মিলিগ্রামে উঠে গিয়েছিল, তাকে দু’মাস টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ সেবন করানোর পর তার কোলেস্টেরলের
পরিমাণ ২০% হ্রাস পায়।  মিনহাজুদ্দিন ও তাঁর সহকর্মীরা এর আগে এও  দেখিয়েছিলেন  যে,  টোকোট্রায়েনল  লিভার
এনজাইমের সাথে  বিক্রিয়া করে  দেহাভ্যন্তরস্থ  বিষাক্ত বস্তু অপসারণ করে এবং  লিভার  টিউমারকে হ্রাস করে অথবা
স্থিতিশীল করে। গত বছরের ইউরোপীয়ান জার্ণাল অব ক্যান্সার প্রিভেনশনে প্রকাশিত গবেষণা পত্র থেকে জানা গেছে
যে, বেশ কিছু সময় ধরে টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ সেবন  করলে সার্বিকভাবে ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে।

মিনহাজুদ্দিন  ২০০৩  সালে  ইউনিভার্সিটি অফ  রচেস্টারের ফ্যাকালটিতে  যোগদানের আগে পর্যন্ত  টোকোট্রায়েনলের
উপর  তাঁর  অধিকাংশ  গবেষণা  তিনি  ভারতেই  করেছেন।  নতুন  দিল-ীর  ইন্ডিয়ান  কাউন্সিল  অফ  এগ্রিকালচারাল
রিসার্চের রিসার্চ ফেলোশীপ ফান্ড থেকে তাঁর গবেষণার ব্যয় পরিচালিত হয়েছিল।

সূত্র: ইন্টারনেট : ওয়েবসাইট :www.soyatech.com এর ১৮ই মে তারিখে প্রচারিত তথ্য হতে সংকলিত।