পাম তেলের পুষ্টি গুণ

পাম তেল পাওয়া যায় পাম ফল থেকে। আর পাম ফল যে গাছে ফলে তার সাধারণ নাম হল “অয়েল পাম”
আর বৈজ্ঞানিক নাম হল “এলিইস গিনিনসিস”। অয়েল পাম একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। রোপণের আড়াই থেকে তিন
বছরের মধ্যেই এই উদ্ভিদে ফলন শুরু হয় এবং ২৫ বছর পর্যন্ত এই ফলন অর্থনৈতিকভাবে উপজীব্য থাকে।

পাম ফলকে প্রক্রিয়াজাত করে দু’ধরণের তেল পাওয়া যায়। ফলটির মাংসল অংশ (মেসোকার্প) থেকে পাম তেল
আহরণ করা হয়, আর বীজ বা শাঁস থেকে যে তেল পাওয়া যায় তাকে বলা হয় পাম কার্ণেল তেল। প্রতিটি ফল থেকে
৯ ভাগ পাম তেল ও ১ ভাগ পাম কার্ণেল তেল পাওয়া যায়।

পাম তেল ভোজ্য তেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাম তেলের এই
ক্রমবর্দ্ধমান জনপ্রিয়তার কারণ হচ্ছে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতিতে পাম তেলের উপযোগিতা এবং এ তেলের বিশেষ পুষ্টি
গুণ।

পাম তেলে বিদ্যমান অনন্য উপাদানের জন্য পাম তেল পুষ্টিতে ভরপুর এবং এর ব্যবহারও বহুমুখী। পাম তেলের মধ্যে
সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত উপাদান সমপরিমাণে থাকায় পাম তেল অর্দ্ধজমাট ঘনত্বে অবস্থান করে। যার ফলে পাম তেল
অনেক ধরণের খাবার তৈরির জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। মার্জারিন, শর্টনিংস ও বনস্পতি উৎপাদনে এবং ø্যাক
ফুডের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রাইং এর কাজে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পাম তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। পাম তেল ব্যবহারে ব্যয়ের সাশ্রয়
হয় কারণ ব্যয়বহুল হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়া ছাড়াই পাম তেল ব্যবহার করা যায়। এছাড়া হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ায়
তেলে ট্রান্স ফ্যাটি এসিড তৈরি হয় যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। পাম তেল ব্যবহারে হাইড্রোজিনেশন
প্রক্রিয়ার প্রয়োজন না হওয়াতে পাম তেল থেকে উৎপাদিত পণ্যে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাটি এসিড থাকে না।

মিল ও শোধনাগারগুলোতে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের সংগে সংগে পরিবহন ও হ্যান্ডলিং এর সময়ও মান পরীক্ষার ব্যবস্থা
থাকায় পাম তেল একটি আর্ন্তজাতিক মানের উন্নত ভোজ্য তেল হিসেবে পরিগণিত। পাম তেল কোলেস্টেরল মুক্ত
এবং সহজপাচ্য, দেহে সহজে শোষিত হয় ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।

পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক এন্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় এবং এর সম্পৃক্ত উপাদানের জন্য উচ্চ তাপমাত্রায় এ
তেল স্থায়ী। এ কারণে ভাজা ও ভূনা খাদ্য তৈরীতে পাম তেল অত্যন্ত উপযোগী। উচ্চ তাপমাত্রায় স্থায়ীত্বের কারণে
পাম তেলে ভাজা খাদ্য দ্রব্য অধিক সময় পর্যন্ত খাদ্যোপযোগী থাকে। আবার পরিশোধিত পাম তেল গন্ধশূন্য
হওয়াতে পাম তেলে ভাজা খাদ্যের স্বাভাবিক গন্ধ বজায় থাকে।

খাদ্য মাত্রেরই পুষ্টি গুণ রয়েছে। খাদ্যে নিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টি বিধায়ক উপাদান থাকে যা দেহকে শক্তি প্রদান করে এবং
দেহের টিস্যু প্রতিস্থাপন করে। পুষ্টি বিধায়ক পদার্থগুলো দু’ধরণের, যথা ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট ও মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট।
ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্টগুলো আমাদের শরীরে বেশি পরিমাণে দরকার হয়, যথা প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, তেল/চর্বি
ইত্যাদি। আর মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্টগুলো খুবই স্বল্প পরিমাণে প্রয়োজন হয়, যেমন ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি।

তেল/চর্বির অধিকাংশই হচ্ছে লিপিড নামক ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা পুষ্টি বিধায়ক পদার্থ। আর রয়েছে কিছু মাইক্রো
নিউট্রিয়েন্ট যার মধ্যে ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’ ও ‘ই’ প্রধান। তেল/চর্বির মধ্যে রয়েছে এমন অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড
যা দেহের জন্য খুবই প্রয়োজন অথচ দেহ তা তৈরি করতে পারে না। এগুলোকে এসেনসিয়াল ফ্যাটি এসিড বা
অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড বলা হয়, যেমন লিনোলিক এসিড।

  • তেল/চর্বি আমাদের শরীরে যা কাজ করে তা হচ্ছে ঃ
  • শক্তি যোগান দেয় ও টিস্যু গঠনে সহায়তা করে।
  • জৈবিক মেমব্রেনের মূল উপাদান।
  • গুরুত্বপূর্ণ অংগসমূহের কুশন হিসেবে কাজ করে ও সেগুলোকে আঘাত থেকে রক্ষা করে।
  • মানবদেহে ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’ ও ‘ই’ এর উৎস ও পরিবাহক এবং ভিটামিন ‘কে’ এর পরিবাহক হিসেবে
    কাজ করে।
  • দেহে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিডের যোগানদার হিসেবে কাজ করে।
  • খাদ্যের স্বাদ ও তৃপ্তিগুণ বর্দ্ধিত করে।
  • সকল ভোজ্য তেল/চর্বিই উপরের কাজগুলো করে থাকে। তবে কিছু কিছু ভোজ্য তেলের কিছু অতিরিক্ত পুষ্টিগুণ রয়েছে
    যা রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শরীরকে কিছু বাড়তি সুবিধা প্রদান করে।

সয়াবীন, পাম, সরিষা, সূর্যমূখী, বাদাম, কর্ণ প্রভৃতি প্রতিটি ভোজ্য তেলই স্বাস্থ্যপ্রদ ও পুষ্টিপ্রদানকারী তেল। তবে
এগুলোর মধ্যে পুষ্টির দিক দিয়ে পাম তেল অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। পাম তেলে বিদ্যমান ভিটামিন ‘ই’ এবং
ক্যারোটিনয়েড এই তেলকে অনন্য পুষ্টি গুণে সমৃদ্ধ করেছে। পাম তেলে প্রায় ৬০০-১০০০ পিপিএম (পার্টস পার
মিলিয়ন) ভিটামিন ‘ই’ রয়েছে। পাম তেলে বিদ্যমান ভিটামিন ‘ই’ দু’ধরণের, যথা টোকোফেরল ভিটামিন ‘ই’ ও
টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’। এর মধ্যে টোকোফেরল এর পরিমাণ ৩০% ও টোকোট্রায়েনল এর পরিমাণ ৭০%।
টোকোট্রায়েনল এর জানা উৎসগুলোর মধ্যে পাম তেলই সমৃদ্ধতম। রাইস ব্রান তেল ছাড়া আর কোন ভোজ্য তেলে
এরকম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে টোকোট্রায়েনল ভিটামিন ‘ই’ নেই। উল্লেখ্য যে এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে
টোকোফেরলের তুলনায় টোকোট্রায়েনলের ক্ষমতা অনেক বেশি।

ক্যারোটিনয়েডের সমৃদ্ধতম প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ উৎসসমূহের অন্যতম হচ্ছে অপরিশোধিত পাম তেল যার মধ্যে ৫০০-
৭০০ পিপিএম ক্যারোটিনয়েড রয়েছে। পাম তেলে গাজরের তুলনায় ১৫ গুণ ও টম্যাটোর তুলনায় ৫০ গুণ অধিক
ক্যারোটিনয়েড আছে। আর কোন উদ্ভিজ্জ তেলে এরকম উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যারোটিনয়েড নেই। পাম তেলের
মোট ক্যারোটিনয়েডের ৯০%ই হচ্ছে আলফা ও বিটা-ক্যারোটিন। আর অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে রয়েছে
লাইকোপিন, ফাইটোইন এবং জি-ক্যারোটিন। ক্যারোটিনয়েড অপরিশোধিত তেলকে উজ্জ্বল লাল-কমলা রং প্রদান
করে। এখন বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিশোধন করে “লাল পাম তেল” উৎপাদন করা হচ্ছে যাতে ৮০% এরও অধিক
ক্যারোটিনয়েড ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

পাম ভিটামিন ‘ই’ একটি শক্তিশালী জৈব এন্টি-অক্সিডেন্ট যা জারণ এবং এথেরোসক্লেরোটিক প্রক্রিয়া প্রতিহত করে।
টোকোট্রায়েনলের রয়েছে ব্লাড কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণকারী এবং ক্যান্সাররোধী গুণ। আবার পাম ক্যারোটিনয়েডগুলোর
রয়েছে জারণরোধী ও ক্যান্সাররোধী গুণ। পাম তেলে এই দুই ভিটামিনের অধিক পরিমাণে উপস্থিতির কারণে পাম
তেল কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা মানবদেহের স্বাস্থ্যরক্ষায় উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। বিশ্বখ্যাত
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত সমীক্ষায় প্রমাণিত পাম তেলের বিশেষ স্বাস্থ্যপ্রদ গুণাবলী সম্পর্কিত কিছু তথ্য নিুে
দেওয়া হল :

  • পাম তেল কোলেস্টেরল মুক্ত ভোজ্য তেল এবং পাম তেল ব্যবহারে রক্তের মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা
    বাড়ে না। তবে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস পায় এবং উপকারী এইচডিএল
    কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
  • পাম তেল রক্তের জমাট বাধাঁর প্রবণতা হ্রাস করে যার ফলশ্র“তিতে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
  • পাম তেল ধমনীতে প্লাক গঠনে সহায়তা করে না।
  • পাম তেল ক্যান্সার রোধে সহায়তা করে।
  • পাম তেলের জারণরোধী ভূমিকার কারণে পাম তেল দেহের কোষগুলোর বয়ো-বৃদ্ধি (ধমবরহম) প্রক্রিয়া
    প্রতিহত করে।

পাম তেলের অনন্য পুষ্টিগুণের কারণে পাম তেল আজ বিশ্বব্যাপী আদৃত হচ্ছে। বর্তমানে ভোজ্য তেল হিসেবে রান্নার
কাজে ব্যবহার ছাড়াও মাখনের বিকল্প মার্জাারিন তৈরিতে একটি স্বাস্থ্যপ্রদ উপাদান হিসেবে ইউরোপের দেশগুলোতে
পাম তেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে এ তেলের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১২ সালে দশ লক্ষ টন
পাম তেল এ দেশে আমদানী করা হয়েছে, যা মোট ভোজ্য তেল আমদানীর প্রায় ৬৭ ভাগ। পাম তেলের এই আমদানী
বৃদ্ধি এদেশের পুষ্টি সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।