পাম তেল — একটি নিরাপদ ভোজ্য তেল

ভোজ্য  তেল/চর্বি  সম্পর্কে  মানুষের  জ্ঞান  যখন  সীমিত  ছিল  তখন  সম্পৃক্ত/অসম্পৃক্ত  তেল/চর্বি  নিয়ে  কারো  কোন
মাথাব্যথা  ছিল না। মানুষ  নির্বিবাদে প্রাণীজ  চর্বি যথা মাখন/ঘি, মাংসের সংগে সংযুক্ত  চর্বি ইত্যাদি  খেয়েছে।  কিন্তু
তেলচর্বি  সম্পর্কে জ্ঞানের ক্রমবিকাশের  ফলে  মানুষ  জানতে  পেরেছে  সম্পৃক্ত  চর্বি  তথা  প্রাণীজ  চর্বি  স্বাস্থ্যের  জন্য
ক্ষতিকারক  বিশেষ  করে  খাদ্যে  এগুলোর  অপরিমিত  ব্যবহার  হৃদরোগের  ঝুঁিক  বাড়ায়।  তখন  প্রাণীজ  চর্বির  বিকল্প
হিসেবে উদ্ভিজ্জ চর্বির ব্যবহার শুরু হল। উদ্ভিজ্জ  তেল যা সাধারণ তাপমাত্রায় তরল থাকে তাকে হাইড্রোজিনেশন
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমাট চর্বিতে অর্থাৎ বনস্পতি, মার্জারিন ইত্যাদিতে রূপান্তরিত করা হল এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে তা
নিরাপদ চর্বি হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগল। এ দিয়ে তৈরি হল মাখনের বিকল্প মার্জারিন ও ঘি-এর বিকল্প উদ্ভিজ্জ ঘি।

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই উদ্ভিজ্জ চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নিরাপদ চর্বি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু
সাম্প্রতিক সময়ে তেল/চর্বি নিয়ে আরও গবেষণার ফলে জানা গেছে যে এই উদ্ভিজ্জ চর্বিতে ট্রান্স-ফ্যাট থাকার কারণে
তা প্রাণীজ  চর্বির  চাইতেও ক্ষতিকারক।  বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা  গেছে  ট্রান্স-ফ্যাটের কারণে জন্ম-ত্র“টি, ক্যান্সার
ইত্যাদি  হতে পারে। এছাড়া  বিজ্ঞানীরা হৃদরোগের  জন্য  ট্রান্স ফ্যাটকে  ব্যাপকভাবে  দায়ী করছেন।  বিভিন্ন সমীক্ষায়
জানা গেছে  যে, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ট্রান্স-ফ্যাটের অবদান সম্পৃক্ত চর্বির চাইতেও বেশি। ট্রান্স-ফ্যাট  দেহে
মোট কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকারক এলডিএল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে এবং উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা
হ্রাস করে।

ক্ষতিকারক  এলডিএল  কোলেস্টেরলের  অধিক  মাত্রা  কোরোনারী  হৃদরোগ  ঘটানোতে  বড়  ধরণের  অবদান  রাখে।
এলডিএল কোলেস্টেরলের আংশিক অক্সিডেশনের ফলে ব্লাড ভেস্ ্লগুলোতে প্লাক (plaque) জমে। এই প্লাক
রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে যার ফলে বুকে ব্যথা, দম বন্ধভাব ও ক্লান্তি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। এছাড়া এই প-াক
রক্তের ক্লট (clot) গঠনে সহায়তা করে যার ফলে রক্ত প্রবাহ বাধা প্রাপ্ত হয়ে হার্ট এটাক অথবা স্ট্রোক হয়।

এসব কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের  দেশগুলোতে  ট্রান্স-ফ্যাটের ব্যবহার সীমিত করার লক্ষ্যে খাদ্য
পণ্যের লেবেলে ট্রান্স-ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ করে দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে যাতে ভোক্তারা জানতে পারে তারা
কতটুকু  ট্রান্স-ফ্যাট  খাচ্ছে।  আবার  কোন  কোন  ক্ষেত্রে  ট্রান্স-ফ্যাটের  ব্যবহার  একেবারে  নিষিদ্ধ  করা  হয়েছে  যেমন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির রেস্টুরেন্টগুলোতে ট্রান্স-ফ্যাটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ট্রান্স-ফ্যাটের স্বাস্থ্যগত কোন উপকার নেই বরং ক্ষতিকারক দিক এত বেশি যে স্বল্পমাত্রায় ট্রান্স-ফ্যাটের ব্যবহারও বড়
ধরণের ক্ষতি করতে পারে। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন (AHA), ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (FDA) এবং
ইউনাইটেড  স্টেটস  ডিপর্টিমেন্ট অফ এগ্রিকালচার  (USDA) মত প্রকাশ করেছে  যে, সম্পৃক্ত  চর্বির পরিমাণ  মোট
ক্যালরির ১০% এর বেশি হওয়া উচিত নয় এবং ট্রান্স-ফ্যাটের পরিমাণ হওয়া উচিত শূন্য।

স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে কিভাবে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ ক্যালরির ১০% এর বেশি যাতে না হয় এবং ট্রান্স-
ফ্যাটের পরিমাণ শূন্য হয় তা অর্জন করা যাবে। আপনি নিম্নলিখিত উপায়গুলোর মাধ্যমে তা অর্জন করতে পারেনঃ
►  খাদ্যে মোট চর্বির পরিমাণ কমিয়ে ফেলুন। খাদ্যে মোট চর্বির পরিমাণ কমালে শুধু ট্রান্স-ফ্যাট নয়, সম্পৃক্ত
ফ্যাট ও কোলেস্টেরল গ্রহণের মাত্রাও কমে যাবে। আপনি মাছ, বাদাম ও বীজ জাতীয় খাদ্য ও উদ্ভিজ্জ
তেল  গ্রহণ  করলে  আপনার  খাদ্যে  ট্রান্স  ফ্যাট,  সম্পৃক্ত  ফ্যাট  ও  কোলেস্টেরলের  পরিমাণ  কমবে  এবং
উপকারী একক-অসম্পৃক্ত ও বহু অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বাড়বে।
►  ট্রান্স-ফ্যাট  সমৃদ্ধ  খাদ্য অর্থাৎ  যেসব  খাদ্য পণ্য উৎপাদনে  হাইড্রোজিনেটেড  উদ্ভিজ্জ  তেল  ব্যবহার করা
হয়েছে সেগুলো একেবারে পরিহার করবেন। কোন খাদ্য পণ্যের লেবেলে উপাদানসমূহের মধ্যে শর্টনিংস
এর নাম থাকলে তা পরিহার করবেন। কারণ শর্টনিংস এর মধ্যে ট্রান্স-ফ্যাট রয়েছে।
►  একটি  নিরাপদ  সুষম  ভোজ্য  তেল  হিসেবে  পাম  তেল  ব্যবহার করতে  পারেন।  পাম  তেলে  সম্পৃক্ত  ও
অসম্পৃক্ত চর্বি প্রায় ৫০ঃ৫০ অনুপাতে থাকায় এটি একটি সুষম ভোজ্য তেল। একক-অসম্পৃক্ত চর্বি হৃদ-
রোগের জন্য উপকারী। পাম  তেলে একক-অসম্পৃক্ত  চর্বির পরিমাণ ৩৯%। পাম  তেলে উল্লেখযোগ্য
পরিমাণে একক-অসম্পৃক্ত চর্বি থাকায় তা  নিয়মিত ব্যবহারে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। উল্লেখ্য  যে,
বাদাম  তেলে  বিদ্যমান একক-অসম্পৃক্ত  চর্বির পরিমানও ৩৯%। অন্য  দিকে কর্ন ও সয়াবীন  তেলে তা
রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে যথাক্রমে ৩০% ও ২৫%। পাম তেলে ১১% অত্যাবশ্যকীয় অসম্পৃক্ত
চর্বি রয়েছে যা দেহের জন্য অত্যাবশ্যক কিন্তু দেহ তা তৈরি করতে পারে না। এছাড়া পাম তেলে অধিক
মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ ও ভিটামিন ‘ই’ থাকায় এ তেল অত্যন্ত পুষ্টিকর। আবার বেকারী ও অন্যান্য খাদ্য
পণ্য উৎপাদনে যেখানে সম্পৃক্ত চর্বির প্রয়োজন সেক্ষেত্রে পাম তেল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এ
তেলে প্রায় ৫০% সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় এ  তেল  বেকারী ও অন্যান্য খাদ্য  শিল্পে ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত
উপযোগী। পাম তেলকে হাইড্রোজিনেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন হয় না বলে এ তেলে
ট্রান্স-ফ্যাট  নেই।  এর  ফলে  এ  তেল  একটি  নিরাপদ  ভোজ্য  তেল।  একই  কারণে  পাম  তেল  থেকে
উৎপাদিত বনস্পতি ও মার্জারিনও নিরাপদ কারণ এগুলোও ট্রান্স-ফ্যাট মুক্ত।

এক কথায় পাম তেল একটি হৃদ-বান্ধব নিরাপদ ভোজ্য তেল যা বাড়ীতে রান্নার কাজেও ব্যবহার করা যায় আবার খাদ্য
পণ্য উৎপাদনের জন্য খাদ্য শিল্পে ব্যবহারেরও অত্যন্ত উপযোগী।

উৎস: মালয়েশিয়ার ‘নিউ সানডে টাইমস’ সেপ্টেম্বর ২, ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধদ্বয় “দি ফাইট এগেইন্সট ট্রান্স ফ্যাট” ও
“পাম অয়েল ইজ এ হেলদি এন্ড সেফ সাবস্টিটিউট”।