বাংলাদেশে ভোজ্য তেল ও চর্বির উৎপাদন ও ব্যবহার

বাংলাদেশ  ১৯৬০  সাল  পর্যন্ত  ভোজ্য  তেল ও  চর্বিতে স্বয়ংসম্পূর্ন  ছিল। তখন  সরিষার  তেল  বাংলাদেশে প্রধান  ভোজ্য  তেল
হিসেবে ব্যবহৃত হত, যা  দেশের চাহিদা  মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে উৎপাদিত হত। এখানে উল্লেখ্য  যে, সরিষার  তেল
বাংলাদেশে প্রাচীন কাল হতে  ভোজ্য  তেল  হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও বাদাম  তেল ও  তিল  তেল উৎপাদিত হত
দেশের ভোজ্য  তেলের চাহিদার  বিকল্প  হিসেবে।  কিন্তু অপর্যাপ্ত উৎপাদন ও উচ্চমূল্য সামস্টিক জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে
থাকার কারণে এর ব্যবহার বাজারে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয় এবং ক্রমান্বয়ে  ভোজ্য  তেল  হিসেবে বাদাম ও  তিল  তেলের
ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। যদিও বর্তমানে এই দুই প্রকার তৈল বীজ স্ন্যাক জাতীয় খাবার তৈরীতে ব্যবহার হচ্ছে। দেশে জনসংখ্যা
বৃদ্ধি এবং মাথাপিছু ভোজ্য তেলের ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় ভোজ্য তেলের উৎপাদন ততটা বৃদ্ধি পায়নি এবং
পরিনামে ১৯৬০ সালের পর হতে দেশে সয়াবীন তেলের আমদানী শুরু হয় যা প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চখ-৪৮০ চুক্তির আওতায়
আসত। স্থানীয় ভোক্তাগণ সয়াবীন তেল কে সহজভাবে গ্রহণ করেনি বরং একে সরিষার তেল অপেক্ষা নিম্ন মানের মনে করত।
তাই সয়াবীন তেল প্রধানত সরকারী রেশনিং এর মাধ্যমে বিক্রী হত এবং নিম্ন আয়ের জনগণই বেশী ব্যবহার করত। পরবর্তীতে
দেশে উৎপাদিত সরিষার  তেলের অপর্যাপ্ত উৎপাদন এবং মূল্য বৃদ্ধির কারণে  ভোক্তাগন সয়াবীন  তেলের  দিকে ঝু ঁকে পড়ে যা
তুলনামূলকভাবে সস্তায় এবং চাহিদার  বিপরীতে সহজেই পাওয়া  যেত আর এভাবেই সয়াবীন  তেলের দখলে চলে যায়  দেশীয়
ভোজ্য তেলের বাজার।

পাম  তেলের প্রবেশ ঘটে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তী  দেশীয়  চাহিদার  বিপরীতে। তবে  ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত এদেশে
অপরিশোধিত পাম  তেল  কে পরিশোধন করার ব্যবস্থা  ছিল না  বিধায় শুধু পরিশোধিত পাম অলিনই আমদানী হত যা  দেশীয়
বাজারে পাম তেল নামে পরিচিত  ছিল। তখন পরিশোধিত অলিন প্রধানত সিংগাপুর হতে আমদানী হত এবং সরাসরি বাজারে
বিক্রী হত। অন্য দিকে, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা সমূহ কর্তৃক সাহায্য হিসাবে আমদানীকৃত পরিশোধিত পাম অলিন সরকার
কর্তৃক রেশনিং এর মাধ্যমে বিতরণ করা হত। উন্নত গুনগত মান এবং বাজার মূল্যের দিক দিয়ে অন্যান্য ভোজ্য তেলের তুলনায়
সস্তা হওয়ায় পাম  তেল দ্রুত  ভোক্তাগণের আস্থা  পেতে সক্ষম হয়।  কিন্তু ১৯৮০ সালের মাঝামাঝিতে পাম  তেলের  বিরূদ্ধে
বিতর্ক এবং ক্রমবর্ধমান বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে পাম তেলের গুরুত্ব কমে যায় এবং আস্তে আস্তে
আমদানী চাহিদাও কমে যায়।

পরবর্তীতে,  ১৯৯০  সালের  দিকে  দেশীয়  ভোজ্য  তেল  পরিশোধন  প্রতিষ্ঠানগুলো  উন্নতমানের  পরিশোধন  প্রযুক্তি  ও  আধুনিক
সুযোগ  সুবিধা  সংবলিত  প্লান্ট  স্থাপন  করায়  অপরিশোধিত  পাম  তেল  আমদানী  শুরু  হয়  এবং  স্থানীয়ভাবে  উৎপাদিত
পরিশোধিত পাম  তেলের সাশ্রয়ী মূল্য ও উন্নত গুনগত মানের কারণে স্থানীয় ভোক্তাদের  নিকট হতে ভাল সাড়া পায়। ১৯৯৮
সালের পর আরো উন্নত মানের ডাবল ফ্রেকশনেটেড পাম তেল যা স্থানীয়ভাবে সুপার পাম নামে বিক্রি হয়, পরিচিতি ঘটার পর
পাম তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকে যা স্থানীয় বাজারে সুপার পাম নামে পরিচিত। বর্তমানে পাম তেলই দেশের অন্যতম
প্রধান ভোজ্য তেল।

দেশীয় উৎপাদন:
বাংলাদেশ  একটি  ঘনবসতিপূর্ন  দেশ  এবং  দেশের  প্রায়  ১৬  কোটি  জনগণ  ১৪৭,৫৭০  বর্গ  কিঃমিঃ  এলাকায়  বসবাস  করে।
তৈলবীজের  জন্য  কৃষি  জমি অপ্রতুল  হওয়ায়  সব  ধরনের  চাষাবাদ  সম্ভব  নয়।  অধিকাংশ  কৃষি  জমি  প্রধান  শস্য  অর্থাৎ  ধান
উৎপাদনে ব্যবহৃত হওয়ায় অল্প কিছু জমিই তৈল বীজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

টেবিল-১: তৈলবীজের ব্যবহার্য কৃষিজমির পরিমান: ২০০৪-০৫ থেকে ২০১১-১২

আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়ায়  দেশে উৎপাদিত ভোজ্য  তেল ও চর্বির প্রাপ্যতা  দিন  দিন কমে যাচ্ছে যা বর্তমানে ২০০,০০০
টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। নিম্নে টেবিল-২ এ বিগত বছরগুলোতে দেশীয় উৎপাদনের বছরওয়ারী হিসাব  দেওয়া হল। সঠিক
পদক্ষেপ ও দিক নির্দেশনার মাধ্যমে কৃষি জমির অপ্রতুলতা ও প্রতিকুল আবহাওয়া সত্ত্বেও এখনও দেশীয় ভোজ্য তেল ও চর্বির
উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

টেবিল-২: দেশীয় ভোজ্য তেল ও চর্বির উৎপাদন: ২০০৪-০৫ থেকে ২০১১-১২

ভোজ্য তেল ও চর্বির চাহিদা:
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পাশাপাশি অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারনে মাথাপিছু  ভোজ্য  তেলের চাহিদা  দিন  দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া
খাদ্যাভাস পরিবর্তন এবং খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের কারনেও তেল ও চর্বির মাথাপিছু চাহিদা বাড়ছে।

টেবিল-৩: মাথাপিছু ভোজ্য তেল ও চর্বির ব্যবহার: ২০০৭-২০১১

পাম, সয়াবীন ও সরিষার তেলই দেশের প্রধান ভোজ্য তেল।  দেশে ব্যবহারিত মোট তেল ও চর্বির প্রায় ৯৭ ভাগই ব্যবহৃত হয়
ভোজ্য  তেল  ও  চর্বি  হিসেবে  আর  বাকী  ৩  ভাগ  ব্যবহৃত  হয়  অভোজ্য  হিসাবে।  অভোজ্য  তেল  ও  চর্বিগুলো  হল  যেমন
ক্রড/আর.বি.ডি পাম  স্টিয়ারিন, পাম কারনেল তেল,  পি,এফ,এ.ডি,  তিসি ও নারিকেল তেল ইত্যাদি। আমরা যদি প্রধান ৩টি
ভোজ্য তেলের ব্যবহার দেখি তাহলে দেখা যাবে ২০০৩ সাল হতে পাম তেল দেশের অন্যতম প্রধান ভোজ্য তেলের স্থান দখল
করে আছে যা ২০১১ এ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৯৯১,০০০ টনে অর্থাৎ মোট ভোজ্য তেল ও চর্বির প্রায় ৬৬ ভাগ। অন্যদিকে ২০১১
সালে সয়াবীন তেল ও সরীষার তেলের ব্যবহার ছিল যথাক্রমে ২৬ ভাগ ও ৮ ভাগ।

পাম  তেল ও সরিষার  তেল প্রধানত  খোলা  তেল  হিসেবে  বেচাকেনা হয় আর সয়াবীন  তেল  বোতলজাত অবস্থায়  বিক্রী হয়।
বোতলজাত পাম  তেলের  ব্র্যান্ড এর প্রাপ্যতা  সয়াবীন  তেলের  বোতলজাত  ব্র্যান্ড এর তুলনায় অনেক কম  হওয়ায় অধিকাংশ
ভোক্তাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারনা বিদ্যমান যে, দেশে ভোজ্য তেল হিসেবে সয়াবীন তেলই প্রধান কিন্তু বাস্তব চিত্রটি তা নয়।

আমদানী মূল্য কম হওয়ায় সাধারণভাবে পরিশোধিত পাম  তেলের মূল্য সয়াবীন  তেলের তুলনায় কম। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে
অপ্রতুল উৎপাদন এবং আন্তজার্তিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে সরিষা তেলের বাজার মূল্য সয়াবীন ও পাম তেলের বাজারমূল্য
অপেক্ষা অনেক বেশী।
টেবিল-৪: মোট প্রধান ৩টি ভোজ্য তেল ও চর্বির আমদানী চিত্র: ২০০০-২০১১

ব্যবহার চিত্র:
বাংলাদেশে  প্রধানত  ভোজ্য  তেলের  ব্যবহারকারীই  বেশী।  বাৎসরিক  তেল  ও  চর্বির  মোট  ব্যবহার  প্রায়  ১৫.৩০  লক্ষ  টনের
বিপরীতে প্রায় ১২.৮০ লক্ষ টন ব্যবহার হয় ভোজ্য তেল হিসাবে এবং বাকী প্রায় ২.৫০ লক্ষ টন ব্যবহৃত হয় চর্বিজাত পদার্থ
হিসেবে  যার  মধ্যে  প্রায়  ২  লক্ষ  ২৫  হাজার  টন  বনস্পতি/শরটেনিং  এবং  ২৫  হাজার  টন  ঘি/বাটার/বাটার  অয়েল  হিসেবে।
ঘি/বাটার/বাটার  অয়েল  সাধারনত  ভোক্তা  পর্যায়ে  অন্যদিকে  বনস্পতি/শরটেনিং  ব্যবহৃত  হয়  বিভিন্ন  খাদ্য  প্রস্তুতকারী  শিল্প
প্রতিষ্ঠান ও রেস্তোরা গুলোতে।

ভোজ্য  তেল  ভোক্তারা  ২  ভাগে  বিভক্ত,  সাধারন  ভোক্তা  যারা  রান্নার  উপকরণ  হিসেবে  ব্যবহার করে  এবং তাদের  বাৎসরিক
ব্যবহারের পরিমান প্রায় ১১ লক্ষ টন আর বাকী প্রায় ২ লক্ষ টন ব্যবহৃত হয়  বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও  রেস্তোরা
গুলোতে।

টেবিল-৫: প্রধান তিনটি ভোজ্য তেলের বছরওয়ারী ব্যবহার: ২০১০-২০১২

নোট:
১/ আমদানীকৃত অপরিশোধিত সয়াবীন তেল ও আমদানীকৃত সয়াবীন বীজ হতে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তেলসহ মোট পরিমান
২/ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষার তেল ও আমদানীকৃত সরিষা বীজ হতে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তেলসহ মোট পরিমান

ভোজ্য তেল ও চর্বির স্থানীয় বাজার মূল্য ও আমদানী ব্যয়:
বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্য তেল ও চর্বির বাৎসরিক বাজার মূল্য পাইকারী দরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা যা খুচরা বাজার
দরে  ১৭  হাজার  কোটি  টাকা।  ভোজ্য  তেলের  চাহিদার  শতকরা  ৯০  ভাগই  যেহেতেু  আমদানী  নির্ভর  তাই  স্থানীয়  বাজার
সম্পূর্নরূপে আন্তজার্তিক বাজারের উপর নির্ভরশীল। আন্তজার্তিক বাজারে মূল্য উঠানামার ফলে স্থানীয় বাজারে ভোজ্য তেল-
চর্বির  মূল্য  উঠানাম  করে। প্রসংগত  উল্লেখ্য  যে,  পাম  তেল আমদানী  হয়  প্রধানত  মালয়েশিয়া  ও  ইন্দোনেশিয়া  হতে আর
সয়াবীন তেল ও সয়াবীন বীজ আমদানী হয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা হতে, অপরদিকে সরিষা/ক্যানোলা বীজ আমদানী হয় কানাডা
ও অস্ট্রেলিয়া হতে।

টেবিল-৬: বছরওয়ারী ব্যবহৃত প্রধান তিনটি ভোজ্য তেলের গড় পাইকারী বাজার মূল্য: ২০১০-২০১২

বর্তমানে বাংলাদেশে ভোজ্য তেল আমদানীর জন্য বছরে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক ও তৈলবীজ আমদানীর জন্য ১০০
মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক ব্যয় হচ্ছে।

টেবিল-৭: ভোজ্য তেল ও তৈলবীজ আমদানী ব্যয় ২০১০-২০১২

ছক- ৩ এর বর্নিত তথ্য মোতাবেক বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু বাৎসরিক ভোজ্য তেল-চর্বির ব্যবহার বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থাদ্বয় কর্তৃক সুপারিশকৃত ২১ কেজির তুলনায় অনেক কম। এমনকি বিশ্বের মাথাপিছু বাৎসরিক ভোজ্য তেল-চর্বির গড়
ব্যবহার ১৬ কেজি অপেক্ষাও কম। খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে তেল ও চর্বি যেহেতু শক্তির আধার সেহেতু ইহার ব্যবহার সঠিক মাত্রায়
হওয়া উচিত যা সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। তাই দেশের জনগণের সুস্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করতে দেশে ভোজ্য তেলের ব্যবহার আরও বৃদ্ধি
পাওয়া প্রয়োজন যা মিটানোর জন্য ভোজ্য তেলের বাজারমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা আবশ্যক।