সংমিশ্রিত ভোজ্য তেল ― নিরাপদ ও উন্নতমানের ভোজ্য তেল

ভোক্তারা সবসময় অভিযোগ করে আসছেন যে, অধিক লাভের জন্য স্থানীয় বাজারে খুচরা বিক্রেতারা পাম তেল ও
সয়াবিন তেল মিশিয়ে বিক্রি করছেন, যদিও দেশে প্রচলিত ফুড রুল অনুযায়ী তা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এই খুচরা
বিক্রেতারা যে তাঁদের অজান্তে ভোক্তাদের উপকার করে আসছেন তা জানা গেল গত ২৮শে মে ২০০৫ তারিখে
ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইন্সটিটিউট কর্তৃক ঢাকায় আয়োজিত “হৃদবান্ধব ভোজ্য তেল” শীর্ষক
সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণা পত্র সমূহ থেকে।

উক্ত সেমিনারে দেশী ও বিদেশী বক্তাদের উপস্থাপিত বক্তব্য থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল। তাঁরা
জানালেন বিশ্বের বহুদেশের মত বাংলাদেশেও হৃদরোগের প্রকোপ আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। আমাদের খাদ্যের
মাধ্যমে গৃহীত তেল-চর্বি এই হৃদরোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণগুলির একটি। রান্নায় ব্যবহৃত ভোজ্য তেল-চর্বির মাধ্যমেই
আমরা প্রধানত দেহের প্রয়োজনীয় তেল/চর্বির যোগান পেয়ে থাকি। এ কারণে রান্নার জন্য ব্যবহৃত ভোজ্য তেল যাতে
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যপ্রদ হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বক্তাদের বক্তব্য থেকে আরও জানা গেল যে ‘আমেরিকান হার্ট
এসোসিয়েশন’ (AHA) এর মতে আদর্শ ভোজ্য তেলে সম্পৃক্ত, একক-অসম্পৃক্ত ও বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডগুলো
০.৭:১.৩:১ অনুপাতে থাকতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে প্রকৃতিতে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোন ভোজ্য তেলের
অস্তিত্ব নেই।

এক পুষ্টি বিজ্ঞানী জানালেন এর দুটো সমাধান রয়েছে। একটা হল দুপুরের খাবার এক তেল দিয়ে এবং রাতের খাবার
আর এক তেল দিয়ে রান্না করা। যেমন দুপুরের খাবার পাম তেল দিয়ে এবং রাতের খাবার সরিষার তেল দিয়ে অথবা
দুপুরের খাবার পাম তেল দিয়ে এবং রাতের খাবার সয়াবিন তেল দিয়ে রান্না করা। এতে করে ব্যবহৃত ভোজ্য তেলের
ফ্যাটি এসিডের অনুপাত “আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন” কর্তৃক উল্লেখিত মানের কাছাকাছি মাত্রায় পৌঁছাবে।

তবে সঠিক সামাধান হল দুটি বা তার অধিক ভোজ্য তেলের সংমিশণ ঘটিয়ে ফ্যাটি এসিডগুলোর মাত্রা আদর্শ ভোজ্য
তেলের অনুরূপ করা। এই সংমিশ্রিত ভোজ্য তেল আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশেই প্রচলিত আছে। এমন কি
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে সংমিশ্রিত ভোজ্য তেলের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ হচ্ছে। কিন্তু
আমাদের দেশে আইনগত বাধার কারণে তা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পিওর ফুড রুল অনুযায়ী দুটি ভোজ্য তেলের
সংমিশ্রণ দন্ডনীয় অপরাধ।

কিন্তু যদি ভোজ্য তেলের সংমিশ্রণ এদেশেও অনুমোদিত হয়, তাহলে ভোক্তারা হৃদহিতকর ভোজ্য তেল পাবেন। কারণ
এককভাবে কোন ভোজ্য তেলই হৃদহিতকর নয়। বেশি মাত্রায় সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড যেমন হার্টের জন্য কল্যাণকর নয়,
তেমনি একক বা বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডেরও অনেক অকল্যাণকর দিক রযেছে। গত ৪ঠা মে তারিখে আমেরিকান
অয়েল কেমিষ্টস সোসাইটির (অঙঈঝ) বার্ষিক সম্মেলনে উত্থাপিত সর্বশেষ গবেষণা পত্র অনুযায়ী উচ্চ তাপমাত্রায়
অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থেকে এইচ.এন.ই. (৪-হাইড্রক্সি-ট্রান্স-২-নোনেনাল) নামক বিষাক্ত যৌগ উৎপন্ন হয় যার সংগে
এথেরোসক্লেরোসিস, স্ট্রোক, পারকিনসনস, আলঝেইমারস, হান্টিংটনস ডিজিজ এবং যকৃতের বিভিন্ন অসুখের সম্পর্ক
রয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য যে, সয়াবীন, সূর্যমুখী, কর্ন ইত্যাদি তেলে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড বহুল পরিমাণে
থাকে। কাজেই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যপ্রদ ভোজ্য তেল পেতে হলে দুটি বা ততোধিক ভোজ্য তেলের সংমিশ্রণ করা
প্রয়োজন।

সংমিশ্রিত তেলের মান এবং গুণাগুণ বেশিদিন অক্ষুন্ন থাকে এবং এর ফ্রি ফ্যাটি এসিড সহসা বৃদ্ধি পায় না। একই
তেলে কয়েকবার খাদ্যদ্রব্য ভাজা যায়। বারে বারে ব্যবহারেও এতে পলিমার বা কোন বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন হয় না।
সংমিশ্রিত ভোজ্য তেলে আর যে সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে তা হল এ তেল ভাজা-ভুনার জন্যও আদর্শ হবে। সয়াবিন ও
পাম তেলের মিশ্রণে প্রস্তুত সংমিশ্রিত ভোজ্য তেলে ১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরপর ৫দিন ধরে ১৪ ব্যাচ
পোট্যাটো ফ্রাই করে দেখা গেছে এতে পোট্যাটো ফ্রাইয়ের গুণগত মান অক্ষুন্ন রয়েছে।

সেমিনারে পুষ্টি বিজ্ঞানীরা সংমিশ্রিত তেলের এদেশে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ চালু করার নিমিত্তে খাদ্য আইনের
প্রয়োজনীয় অংশ সংশোধন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বিজ্ঞানের বিকাশ থেমে নেই। মানব কল্যাণে
বিজ্ঞানের নতুন নতুন গবেষণালব্ধ ফলকে কাজে লাগাতে আমাদের দ্বিধা থাকা উচিত নয়। সংমিশ্রিত ভোজ্য তেল যদি
স্বাস্থ্যগত ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত হয় তাহলে এ তেল ব্যবহারের বাধা অপসারণ করতে সকলেরই এগিয়ে আসা
প্রয়োজন ।