পাম তেল-বাংলাদেশেরঅন্যতম প্রধান ভোজ্য তেল

বাংলাদেশের জনগণের কাছে মালয়েশিয়া ও পাম তেল একটি সমার্থক শব্দ। এর অন্যতম কারণ মালয়েশিয়া হতে আমদানীর মাধ্যমেই পাম তেল বাংলাদেশের জনগণের কাছে পরিচিতি পায় এবং বর্তমানে মালয়েশিয়াতে কর্মরত প্রায় ৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশীর মাধ্যমে দেশের একটি বৃহৎ জনগণের কাছে ভোজ্য তেল হিসাবে পাম তেল একটি অতি পরিচিত নাম।

২০১৩ সালে বাংলাদেশে পাম তেল আমদানীতে এক নতুন রেকর্ড স্থাপিত হয়। উক্ত বছরে দেশে পাম তেল আমদানীর পরিমাণ ছিল ১২,৫৬,৫৮১ টন যা ২০১২ সালের তুলনায় ২২.৩৩% বেশী যা উক্ত বছরে দেশে মোট তেল-চর্বি আমদানীর প্রায় ৭১ ভাগ । উলেখিত  ১২,৫৬,৫৮১ টন পাম তেলের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ টন মালয়েশিয়া হতে আমদানীকৃত ।

পাম তেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত দুই অবস্থাতেই আমদানী করা হয়। অপরিশোধিত পাম অয়েল এবং অপরিশোধিত পাম অলিন দেশের রিফাইনারীগুলোতে পরিশোধন করে রিফাইন্ড অলিন হিসাবে বাজারজাত করা হয়। আর আমদানীকৃত পরিশোধিত পাম অলিন ও পরিশোধিত পামঅয়েলবনস্পতি উৎপাদনে ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে ব্যবহ্ত হয়।

তেল-চর্বির আমদানী:
২০১৩ সালে দেশে পাম তেল এবং মোট তেল-চর্বি উভয়ের আমদানীতেই নতুন রেকর্ড স্থাপিত হয়েছে। মোট তেল-চর্বি আমদানী হয়েছে ১৭,৭৭,৭০৬ টন যা পূর্বের সর্বোচ্চ আমদানীর পরিমাণ ১৬,১৩,৪৯০ টন, যা ২০১২ সালে আমদানী করা হয়েছিল, তা অপেক্ষা ১০.১৮% বেশী। ২০১৩ সালে পাম তেল (পরিশোধিত ও অপরিশোধিত একত্রে) আমদানীর পরিমাণ ছিল ১২,৫৬,৫৮১ টন যা ২০১২ সালের রেকর্ড পরিমাণ আমদানী ১০,২৭,১৯৪ টন অপেক্ষা ২২.৩৩% বেশী। অপরপক্ষে ২০১৩ সালে পাম তেলের প্রধান প্রতিদ্বন্ধী অপরিশোধিত সয়াবীন তেল এর আমদানীর পরিমাণ ছিল ৩,৫৪,৪৩৬ টন যা ২০১২ সালের তুলনায় ২০.৩৫% হ্রাস পায়। ২০১৩ সালে৫,৭৫,৫৪০ টন সয়াবীন বীজ আমদানী করা হয় যা থেকে আহরিত সয়াবীন তেলের পরিমাণ ৯৯,০৮৯ টন। ২০১৩ সালে সয়াবীন বীজের আমদানী ২০১২ সালের তুলনায় ১১১.৪৩% বৃদ্ধি পায়। ২০১৩ সালে মোট সয়াবীন তেল অর্থাৎ আমদানীকৃত অপরিশোধিত সয়াবীন তেল এবং আমদানীকৃত সয়াবীন বীজ হতে স্থানীয়ভাবে আহরিত অপরিশোধিত সয়াবীন তেলের একত্রিত পরিমাণছিল ৪৫৩,৫২৫ টন যা ২০১২ সালের তুলনায় ৭.৮০% কম। উক্ত বছরে আমদানীকৃত ক্যানোলা/সরিষা বীজের পরিমাণ ছিল ৯৩,৪৩৪ টন যা থেকে আহরিত তেলের পরিমাণ ৩৫,৫০৫ টন। ২০১৩ সালে ক্যানোলা/সরিষা বীজের আমদানী ২০১২ সালের তুলনায় ৪৫.১৯% হ্রাস পায়।

সারণী-১: তিনটি প্রধান ভোজ্য তেল তথা মোট তেল-চর্বির আমদানী (২০০৮-২০১৩)

এটা স্পষ্ট যে দেশে পাম তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে যার ফলে ২০১৩ সালে অধিক পরিমাণে পাম তেল আমদানী হয়। কৃষি পণ্যের ভাল দাম পাওয়াতে পল্লী অঞ্চলের জনগণ যারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫%, তাদের জীবন যাত্রার মান তথা তাদের গৃহীত খাদ্যেরও মানোন্নয়ন ঘটে। এর ফলে গ্রামীণ অঞ্চলে ভোজ্য তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, যেখানে পাম তেলের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে পাম তেলই প্রধান ভোজ্য তেল হিসাবে ব্যবহƒত হয়। এছাড়া দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলোতেও পাম তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পাম তেলের ব্যবহার তথা আমদানী বৃদ্ধিতে কিছুটা অবদান রাখছে। ২০১৩ সালে তিনটি প্রধান ভোজ্য তেলের মধ্যে পাম, সয়াবীন ও ক্যানোলা/সরিষার তেলের আমদানীর অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৭২:২৬:২ যা ২০১২ সালে ছিল যথাক্রমে ৬৫:৩১:৪।

তেল-চর্বির ব্যবহার:
অয়েল ওয়ার্ল্ডের তথ্য অনুযায়ী  তেল-চর্বির দ্রুত সম্প্রসারণশীল বাজারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের তেল-চর্বির বাজার অন্যতম। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ২০১২-১৩ সালে বাংলাদেশে তেল-চর্বির ব্যবহার প্রায় ১৮ লক্ষ টনে গিয়ে দাঁড়াবে যার অর্থ ১০ বছরে ৭১% প্রবৃদ্ধি অর্জন। এতে মাথাপিছু মোট তেল-চর্বির ব্যবহার ১২ কেজিতে গিয়ে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে ব্যবহƒত ভোজ্য তেল-চর্বির মধ্যে ৮৫% হচ্ছে তরল তেল ও ১৫% হচ্ছে চর্বি অর্থাৎ বনস্পতি, শর্টনিং, মাখন ইত্যাদি।

বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মাথাপিছু ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে তেল-চর্বির মোট ব্যবহার বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং উন্নত মানের খাদ্য গ্রহণের ফলে তেল-চর্বির মাথাপিছু ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাম তেল পাম ওলিন রূপে সর্বাপেক্ষা অধিক ব্যবহƒত ভোজ্য তেল। গত ৩ বছর সময়ে বাংলাদেশে পাম তেলের গড় মার্কেট শেয়ার ছিল ৬৪-৬৭% ।দেশে ব্যবহƒত তেল-চর্বির ৮০%-ই খোলা অবস্থায় বিক্রী হয় এবং খোলা তেলের বাজারে পাম তেলের প্রাধান্য । পাম তেল রন্ধন তেল হিসাবে ও খাদ্য শিল্পগুলোতে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহ্ত হয়।

স্থানীয় বনস্পতি/শর্টনিং উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পাম  তেলের অন্যতম প্রধান ব্যবহারকারী। দেশে বছরে প্রায় ২,৫০,০০০ টন বনস্পতি/শর্টনিং তৈরী করা হয়। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলোর মধ্যে বেকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তেল-চর্বির বৃহৎ ব্যবহারকারী। দেশে প্রায় ৩,০০০ বেকারী রয়েছে যাদের অধিকাংশই নন-মেকানাইজড্। এদের উৎপাদিত বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারী দ্রব্যের বার্ষিকউৎপাদনের সম্মিলিত পরিমাণ ৬,০০,০০০ টন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১,০০,০০০ টন তেল-চর্বি ব্যবহার করে। বিস্কুট ও বেকারী দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পছন্দনীয় তেল হল পাম তেল তা তরল বা জমাট যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন। কারণ তাদের উৎপাদিত পণ্যগুলোর উচু মান রক্ষায় পাম তেল অনন্য। বর্তমানে বাংলাদেশে শুধু পাম তেল থেকেই বনস্পতি/শর্টনিং তৈরী করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য খাদ্য শিল্পগুলো যথা সবধরনের চিপস, ফ্রায়েড  ফুড, ইনস্ট্যান্ট নুডলস কনডেন্সড মিল্ক, চকোলেট ইত্যাদি উৎপাদনকারী শিল্পগুলো পাম তেল পছন্দ করে ব্যবহার করে। খাদ্য শিল্প ছাড়া হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ফাস্ট ফুড শিল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাম তেল ও বনস্পতি ও শর্টনিংস ব্যবহার করে।  চকোলেট, আইসক্রীম ও প্রসাধনী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে পাম কার্ণেল তেল। আর সাবান উৎপাদনকারীরা ব্যবহার করে পাম কার্ণেল তেল, পাম স্টিয়ারিন, এবং পাম ফ্যাটি এসিড/এসিড অয়েল।

উদ্ভিজ্জ চর্বি অর্থাৎ বনস্পতি/শর্টনিং প্রধানত: শহর এলাকাগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবহƒত হয়। শহর এলাকার ধনী ব্যক্তিদের কাছে ঘি ও মাখন জনপ্রিয়। আর তরল ভোজ্য তেল শহর/গ্রাম সব এলাকারই সাধারণ ভোক্তারা ব্যবহার করে। গ্রাম এলাকার ও শহরের নিন্ম আয়ের জনগণ খোলা তেল ক্রয় করে এবং মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত লোকেরা কনজ্যুমার প্যাক তেল পছন্দ করে।

পাম তেলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
বাংলাদেশ পাম তেলের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার। ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশে পাম তেল সর্বাধিক আমদানীকৃত ও ব্যবহƒত ভোজ্য তেল এবং এর আমদানী প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১২.৬ লক্ষ টন পাম তেল আমদানী করা হয়। ২০০০ সালে যার পরিমাণ ছিল ১.৭০ লক্ষ টন অর্থাৎ ১৩ বছরের মধ্যে পাম তেলের বাজার প্রায় ৭.৫ গুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে পাম তেল সর্বপ্রথম সয়াবীন তেলের আমদানী ও ব্যবহারের পরিমাণকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশে সর্বাধিক আমদানিকৃত ও ব্যবহ্ত ভোজ্য তেল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এদেশে পাম তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পিছনে চালিকা শক্তি হিসাবে যে উপাদানগুলো কাজ করছে তা হল পাম তেলের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনগণের আয় বৃদ্ধি বিশেষত: গ্রামাঞ্চলে যেখানে পাম তেলের ব্যবহার বেশী, ভোজ্য তেলের দেশজ উৎপাদনে প্রায় স্থবির অবস্থা, নগরায়ণ, খাদ্যাভাস পরিবর্তন ও উন্নত মানের খাদ্য গ্রহণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার পাম তেলের বাজার সম্প্রসারণে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটা গুরত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। গ্রামাঞ্চলের জনগণ বাজারজাত করার জন্য যে কৃষিপণ্য উৎপাদন করে তার ভাল দাম পাওয়াতে তাদের আয় বৃদ্ধি হয়েছে। এতে করে গ্রামীন জনগণ এমন খাবারের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে যা তৈরী করতে ভোজ্য তেলের প্রয়োজন হয়। যার ফলে মাথাপিছু ভোজ্য তেলের ব্যবহার বাড়ছে গ্রামাঞ্চলে যেখানে পাম তেল পছন্দনীয় তেল। যেহেতু গ্রামাঞ্চলের জনগণের মোট সংখ্যা বিশাল, তাদের ব্যবহƒত ভোজ্য তেলের অর্থাৎ পাম তেল মোট ব্যবহারের পরিমাণও বিশাল। আবার নগরায়ণের সংগে সংগে শিল্প কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে শহর এলাকার জনগণের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে। ব্যস্ত নগরবাসী তাদের নাস্তা ও লাঞ্চে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যেমন, পাউরুটি, সিরিয়াল, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ইত্যাদি গ্রহণ করছে। জনগণের এই পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসের জন্য খাদ্য শিল্পের বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ ঘটছে যেগুলোতে পাম তেল অথবা পাম ভিত্তিক বনস্পতি/শর্টনিংস অন্যতম প্রধান উপাদান হিসাবে ব্যবহƒত হয়। এসব কারণে দেশে পাম তেলের ব্যবহার ও আমদানী বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামীতেও বৃদ্ধি পাবে। দেশে গড় ব্যবহার বৃদ্ধির হার অনুযায়ী ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাম তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণের একটা চিত্র সারণী-৩ এ পাওয়া যাবে।

দ্রষ্টব্য:
এ, কে, এম, ফখরুল আলম কর্তৃক রচিত এই লেখাটি গত ৩১শে আগস্ট, ২০১৪ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল