পুরোনো ভোজ্যতেল নিয়ে কিছু নতুন ভাবনা

তেলটি অনেক পুরোনো। অভিজ্ঞ মহলের মতে প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে এই তেলটি মানুষ ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তাই একে নিরাপদ এবং ভোজনযোগ্য বলতে দ্বিধা থাকার কথা নয়। এই তেলটি হলো পাম ফল থেকে আহরণকৃত পাম তেল। পাম ফলের এই তেল বিশ্বজুড়ে খাদ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদনে সমানভাবে উপযোগী ও উপকারী বিবেচিত হচ্ছে। তেল উৎপন্নকারী এই ফসল একঅর্থে ভিন্নরকমের কারণ পাম ফল থেকে দু’রকমের তেল উৎপন্ন হয়। পামফলের মাংসল অংশ থেকে পাম তেল ও পাম বীজের শাঁস থেকে পাম কার্ণেল তেল উৎপাদন করা হয়।

সাম্প্রতিককালে ভাজা-ভুনা খাবার খাওয়ার চল খুব বেশি। একে এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ফ্রাইং বা ভাজা-ভুনা খাবার তৈরীর জন্য সব তেল নিরাপদ নয়। কারণ ফ্রাইং বিশেষ করে ডীপ ফ্রাইং করতে হয় উচ্চ তাপমাত্রায়। দেখা গেছে এই উচ্চ তাপমাত্রায় অনেক ভোজ্য তেলেই অক্সিডেশন ঘটে। যার ফলে ব্যবহৃত তেলটির এবং ঐ তেলে রান্না করা খাবারের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু পাম তেলের সংযুতিই এমন যে এ তেলটি উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হয় না এবং এতে রান্না করা খাবারও দীর্ঘসময় খাদ্যোপযোগী থাকে। অন্যান্য ভোজ্য তেলের তুলনায় পাম তেলে স¤পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি থাকায় এর ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার নিয়ে কথা উঠে। তবে গবেষকমহল দেখেছেন  পাম তেলে অস¤পৃক্ত ও স¤পৃক্ত চর্বির একটি সুষম অনুপাত রয়েছে যার ফলে পাম তেল শুধু উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলই নয় বরং হৃদবান্ধবও। পাম তেল উদ্ভিজ্জ তেল হওয়াতে এটি কোলেষ্টেরোল মুক্তও বটে।

এতে আছে ৪০% ওলিক এসিড যা একটি মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, ১০% পলিআনস্যাচুরেটেড  লিনোলিক এসিড, ৪৪% স্যাচুরেটেড পামিটিক এসিড ও ৫% স্যচুরেটেড স্টিয়ারিক এসিড। ফ্যাটিএসিড গুলোর এমন সমাহার একে ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য প্রয়োগের ক্ষেত্রেও উপযোগী করে তুলেছে।

আর একটি সুবিধা আছে। কক্ষতাপে এই তেল অর্ধ জমাট, তাই বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতিতে এই  তেলকে হাইড্রোজিনেশন করার প্রয়োজন পডেনা। ডীপ ফ্রাইং ও খাদ্য শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী করার জন্য সাধারন তরল উদ্ভিজ্জ তেলকে হাইড্রোজিনেশন করা হয় যাতে আবার উৎপন্ন হয় বিপজ্জনক ট্রান্সফ্যাট। হাইড্রোজিনেটেড তেলে তৈরী খাবার মচমচে হলেও তা হয় খুব স্বাস্থ্যহানিকর।

অপর পক্ষে, পাম তেল অধজমাট হওয়াতে এর হাইড্রোজিনেশন লাগেনা। তাই এ তেল বিপজ্জনক ট্রান্সফ্যাট মুক্ত। খাদ্যে ব্যবহার ছাড়াও পামতেলের অন্যত্রও ব্যবহার রয়েছে।

পাম কার্নেল তেল বা পামবীজের তেল খাদ্যব্যতীত অন্য দ্রব্য উৎপাদনেও প্রয়োগ করা হয় যেমন ওলিওকেমিকেল, সাবান, পিচ্ছিলকরার পদার্থ লুব্রিকেন্টস, এবং প্রসাধনী ইত্যাদি তৈরিতে। আবার পাম কার্ণেল তেল কিছু কিছু খাদ্য ফরমুলেশনে ব্যবহৃত হয় যেমন কফি ক্রিমারস, কনফেকশনারি ফ্যাট ইত্যাদিতে।

পাম তেল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ঋঅঙ) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) কর্তৃক স্বীকৃতি প্রাপ্ত ভোজ্য তেল। অন্যান্য তেলের সঙ্গে এই তেলও মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনে যথাযোগ্য স্থানটি পাচ্ছে ।

উচ্চ উৎপাদনশীল পাম ফল থেকে আহরিত এই তেলে ফ্যাটি এসিডের সুষম সমাহার এবং এ তেলের বিভিন্ন উপকারী বৈশিষ্ট্য যথা হৃদবান্ধব ভিটামিন ই টকোট্রাইনোলে সম্বৃদ্ধ এবং রক্তের কোলেস্টেরোলের উপর এর নিরপেক্ষ প্রভাব, একে বিশ্বপণ্য বাজারে একটি সর্বজনগ্রহনীয় তেল হিসেবে  যথাস্থানে রেখেছে।

-অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী